Friday, July 11, 2014

চিরকালের বাবাদের কথা




এই সিনেমায় ডিজনি আছেন। এটি ডিজনির সিনেমা নয়।এই সিনেমায় "মেরি পপিন্স" বানানোর ইতিহাস আছে। কিন্তু এটা গড়পড়তা  making of a film ও নয়। আসলে এ হল চিরন্তন বাবাদের গল্প। হাসি, কান্না, মজা সব কিছুর ফাঁকে নিরলস যে ধারা বয়ে চলে।
"মেরি পপিন্স"  বইয়ের মলাট

লন্ডনের সতেরো নম্বর চেরি লেন বাড়ির ব্যাংক্স পরিবার আর তাদের বাড়িতে এক ঝড়ে উড়ুক্কু ছাতায় উড়ে আসা এক গভার্নেসকে নিয়ে ১৯৩৪ সালে "মেরি পপিন্স"  বইটি লেখেন পামেলা "পি এল" ট্র্যাভার্স। ব্যাংক্সদের ছোট ছোট বাচ্চারা, জেন, মাইকেল, জন, বারবারার জীবন একেবারে বদলে দেয় মেরি-ম্যাজিকের মত। শত দুঃখ দারিদ্রের মাঝেও পৃথিবী যে কত সুন্দর, তা তাদের শিখায় সে। ধীরে বদলে যান খিটখিটে, কাজ পাগল মিঃ ব্যাংক্সও। অদ্ভুত এক ম্যাজিক রিয়েলিসম এর ছোঁয়া গোটা বইতে। প্রকাশমাত্রেই ক্লাসিকের মর্যাদা পেল এই বই। ঘরে ঘরে বাচ্চাদের কাছের মানুষ হয়ে উঠলো মেরি।  
         একদিন ওয়াল্ট ডিজনি তার দুই মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখলেন দুইজনেই ডুবে আছে একটা বইয়ের মধ্যে। "কি বই রে এটা?" জিজ্ঞেস করতেই বড় মেয়ে বলল, "সেকি বাবা!! তুমি মেরি পপিন্স-এর নাম শোননি!!" ছোট মেয়ে আবদার করলো, "তুমি এটা নিয়ে একটা সিনেমা বানাও না বাবা..." সেই রাত্রে জেগে বইটা শেষ করলেন ডিজনি। দেখলেন অসামান্য সিনেমাটিক উপাদান আছে এই বইতে। মেয়েকে কথা দিলেন তিনি বানাবেন এই সিনেমা..তার মেয়েদের জন্য।
দুই মেয়ের সাথে ডিজনি
আসল যন্ত্রণা শুরু হ'ল এইবার। লেখিকা  "পি এল" ট্র্যাভার্স এক জাঁদরেল মহিলা। তিনি সিনেমা জিনিষটা পছন্দ করেন না। যদিও করেন অ্যানিমেশন তার দু'চোখের বিষ; আর ডিজনির কার্যকলাপ তো তার একেবারেই না পসন্দ। অতএব বারবার ডিজনি তাকে অনুরোধ করতে লাগলেন সিনেমা বানানোর অনুমতি দেবার জন্য...বারবার তিনি নাকচ করলেন। এভাবেই চলল কুড়ি বছর। এর মাঝে অনেক কিছু বদলে গেছে দুনিয়াতে। ট্র্যাভার্স তখন চরম আর্থিক সঙ্কটে । ডিজনি হাল ছাড়েন নি। প্রতি বছর একবার ক'রে অনুরোধ করে যাচ্ছেন, যদি রাজি হন লেখিকা। অবশেষে অভাবের কাছে প্রতিজ্ঞা হার মানলো। ট্র্যাভার্স রাজি হলেন ডিজনির অফারে। কিন্তু শর্ত সাপেক্ষে। এক, সিনেমাটি কিছুতেই  অ্যানিমেশন হবে না; দুই, গোটা স্ক্রিপ্ট আর ফিল্ম     তদারক করবেন তিনি নিজে। নিরুপায় ডিজনি রাজি হলেন। ঠিক এই জায়গা থেকেই এই সিনেমাটি শুরু।
গোটা সিনেমাতে পরতে পরতে ফুটে উঠেছে দুইজন মানুষের কারুণ্য। একজন ডিজনি...যিনি এক চিরন্তন পিতা। মেয়েদের দেওয়া কথা পূরন করতে বদ্ধপরিকর। তার জন্য লেখিকার যে কোন দাবি মেনে নিতেও তিনি রাজি। ডিজনিসুলভ কোন ইগোকে তিনি প্রশ্রয় দেন না। তখন তিনি মেয়েদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক পিতামাত্র। লেখিকা পামেলার সমস্যা অবশ্য গাঢ়তর। তার ছেলেবেলা সুখের ছিল না মোটেই। তিনি তখন বাবার আদরের মণি হেলেন গফ। মদ্যপ বাবা আর অসুস্থ মা। তবু তারই মধ্যে বাবা চেষ্টা করতেন মেয়ের মুখে খানিক হাসি ফোটাতে। তিনিই ছিলেন তার একমাত্র আনন্দের উৎসার। মাঝে মাঝে ভাবতেন যদি এমন কেই আসতো, যে এক নিমেষে দূর করে দেবে সবার সব দুঃখ, তবে কেমন হতো? আর পরবর্তীতে এই চিন্তারই ফসল "মেরি পপিন্স" । সে তার না পাওয়া স্বপ্ন, মনের মনিকোঠার কাউকে না দেওয়া এক সম্পত্তি। তাই তিনি কারও সাথে ভাগ করবেন না তাকে। "মেরি পপিন্স"  আসলে সেই মেয়েটি যা একদিন ছোট্ট গফ হতে চেয়েছিল....পারেনি। প্রতি মূহুর্তে তার ভয়, এই বুঝি ডিজনি ছিনিয়ে নেবেন তার ছোটবেলা। মিঃ ব্যাংক্স  পামেলার মগ্ন চৈতন্যে পরিণত হয় তার পিতা ট্রেভর গফে। এ সিনেমা সেই আবেগেরই প্রকাশমাত্র।
সিনেমাতে ডিজনি ও পামেলার রূপে হ্যাঙ্কস ও থমসন
অভিনয়ে হাসিখুসি ডিজনির ভূমিকায় টম হ্যাঙ্কস একেবারে Perfect choice. বায়োপিকে তিনি চিরকালই তার শ্রেষ্ঠত্বর সাক্ষী রেখেছেন। খিটখিটে পামেলার ভূমিকায় এমা থমসন এক কথায় অনবদ্য। চরিত্রের নির্যাসটুকু কি দারুন তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন রূপালী পর্দায়। তবে চমকে দিয়েছেন 
ট্রেভর গফের চরিত্রে কলিন ফেরেল। পামেলার মদ্যপ এই বাবাটির জন্য আমদেরও চোখ জলে ভরে ওঠে। ছোট একটি ভূমিকায় পল জিওমাটি মাত করে দিয়েছেন। মিষ্টি লেগেছে শিশু পামেলাকে। সব শেষে যখন তৈরি হয়ে যায় সিনেমাটি, তখন অদ্ভুত এক লাবণ্যে দর্শক প্রানপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডিজনির বাবা, পামেলার বাবা, ডিজনি নিজে সব মিলেমিশে পিতৃত্বের অপরূপ এক আবেশে আমাদের ভরিয়ে দেয়। ডিজনির মতো আমরাও যেন ব'লে উঠি, "George Banks and all he stands for will be saved. Maybe not in life, but in imagination. Because that's what we storytellers do. We restore order with imagination. We instill hope again and again and again"

সিনেমা শেষের বহুক্ষণ বাদেও এই অভিঘাত যাবার নয়........                                

Wednesday, July 2, 2014

পুরোনো বোতল, নতুন মদ...


এইমাত্র শেষ ক'রে উঠলাম অ্যাসটেরিক্সের নতুন অভিযান "Asterix and the Pictes "। গত বছর অক্টোবরে প্রকাশিত হওয়া বইটি হাতে পেতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে গেলেও পড়া হ'য়ে বেশ একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ১৯৭৭ এ গোচিনির মৃত্যুর প'র এতদিন ইউদেরজো একাই আমাদের ব'লে গেছেন নাম না জানা সেই পা"গল" গ্রামের গল্প। কিন্তু যতই নষ্টালজিক হই না কেন, স্বীকার করতে বাধা নেই, শেষের দিকে জমেনি একেবারেই। হতাশ  ইউদেরজো ঠিক করেছিলেন "Asterix and the Falling Sky" দিয়েই শেষ হবে অ্যাসটেরিক্সের অভিযান। কিন্তু হাল ছাড়েন নি অ্যান গোচিনি, রেনে গোচিনির মেয়ে। তিনি ইউদেরজোকে বোঝালেন "We got a good thing going, and we want to keep it going for a long while”।
জঁ ফেরি আর সাথে  কনরাদ

তাই এবার অ্যাসটেরিক্সের খোল-নলচে বদলে গেলো পুরোটাই। লিখলেন জঁ ফেরি আর সাথে ছবি আঁকার দায়িত্ব পেলেন ইউদেরজোর শিষ্য কনরাদ।  প্রথমে একটু অবিশ্বাস থাকলেও তা মুছে গেল প্রথম ড্রাফট দেখার পর। খুসি ইউদেরজো জানালেন "এবার আমি নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারি। Thanks to them, the Gaulish village created with my friend Rene Goscinny can go on having new adventures to delight readers of the series" রেনের স্বপ্ন শেষ হলো না মাত্র ৩৪ টি অভিযানে। Alea jacta est ( The Die is Cast).

প্রথম পাতা
হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই শুরু হচ্ছে অ্যাসটেরিক্সের এই অভিযান। গল গ্রামকে এই রূপে আগে কখনো দেখিনি আমরা। "সেবার ফেব্রুয়ারী মাসে দারুণ বরফ পড়েছিল। গোটা গ্রাম ঢেকে গেছিল বরফের আস্তরণে..." এমনভাবেই এই কাহিনি শুরু করতে বলেছিলেন ইউদেরজো। বাকিটা লেখকদের হাতে। ছোট করে গল্পটা বলেই দেই, অ্যাসটেরিক্সের গ্রামে নদীতে ভেসে আসে বরফে জমা এক মানুষ। গেটাফিক্সের জাদু পাণীয়তে চাঙ্গা হয়ে আস্তে আস্তে তার স্মৃতি ফিরে আসে। সে জানায় তার নাম ম্যাকআরুন। সে সূদূর ক্যালেডোনিয়া ( এখন স্কটল্যান্ড) থেকে আসছে। তাকে বন্দি ক'রে জলে ফেলে দিয়েছে দুষ্টু সর্দার ম্যাককেবাস। রোমানেদের সাথে হাত মিলিয়ে সে চায় বুড়ো রাজার সিংহাসন দখল করতে আর বিয়ে করতে রাজকন্যা ক্যামোমিলাকে। রাজকন্যা আবার  ম্যাকআরুনকে ভালোবাসতো দেখে তাকে মেরে ফেলার জন্য জলে ডুবিয়ে দিয়েছে। ফলে ওবেলিক্স আর অ্যাসটেরিক্সের দায়িত্ব পরে ম্যাকআরুনকে দেশে ফিরিয়ে দুষ্টু সর্দার ম্যাককেবাস আর রোমানদের জব্দ করতে। এই হ'ল মোদ্দা গল্প।
এবার আসি আসল কথায়। এতো বছর অপেক্ষার শেষে এই কাহিনি থেকে আমরা কি পেলাম আর কি পেলাম না।
ম্যাকআরুন
পাওয়ার তালিকাটা বেশ বড়-
১। আমরা নিশ্চিন্ত হ'লাম টিনটিনের মত অ্যাসটেরিক্সের অভিযান হঠাৎ থেমে যাবে না।
২। কনরাদের মত একজন আঁকিয়ে পেলাম। না বলে দিলে কে বলবে ইনি ইউদেরজো নন !!!!!
৩। বহুদিন বাদে আবার অ্যাসটেরিক্সকে ব্রিটিশ আইল্যান্ডে দেখা গেল। সেই Asterix in Britain এর পর।
৪।  টানটান কাহিনি । শেষ না ক'রে ছাড়া যাবে না কিছুতেই। আছে স্কটল্যান্ড ভ্রমণের মজা, লক নেসের দানবের কীর্তি আর জলদস্যু রেড বেয়ার্ড। 
 কিন্তু পাশেই না পাওয়াটাও নেহাত কম না। এক এক করে বরং বলি-
লক নেসের দানব
১। গোচিনিকে বড্ড মনে পড়ছিল বারবার। অ্যাসটেরিক্সের কাহিনির যে অন্তর্লীন হাস্যরস, সেটা প্রায় উধাও। অ্যাসটেরিক্স বেশ কাঠ খোট্টা। মজার ধার ধারে না। হাসির কিছু মুহুর্ত তৈরি হতে হতেও কেমন যেন উধাও হয়ে যায়। কোথাও কোথাও তো বেশ জোর ক'রে হাসতে হচ্ছে (অ্যাসটেরিক্সে হাসব না!! এই ভেবে)
২। গল্প পুরো ছকে ফেলা। সেই গ্রাম দিয়ে শুরু, অচেনা অতিথি, অভিযান...কিন্তু আগে তার মধ্যেই যে twist   টা আসতো , সেটা আসে নি।
৩। রোমানদের যেন রাখাত জন্যই রাখা হয়েছে। না থাকলেও কাহিনিতে কোন পার্থক্য হত না। যেমন হত না Limitednumbus নামের আদম সুমারির লোকটি না থাকলে।
৪। ডিজনির প্রভাব এই প্রথম অ্যাসটেরিক্সে দেখলাম। রাজকন্যা ক্যামোমিলার সাথে ডিজনির Brave এর প্রচুর মিল। লক নেসের দানব যেন ডিজনি কমিক্স থেকে উঠে এসেছে।
তাই অ্যাসটেরিক্সের এই অভিযান যেন পুরোনো বোতলে রাখা নতুন মদ। আমরা যারা অ্যাসটেরিক্সের অন্ধ ভক্ত তারা সেই পুরোনো মদের স্বাদ পেতে অধীর আগ্রহে ব'সেছিলাম। যা পেলাম তার বহিরঙ্গ আগের মত হলেও ভিতরে অনেক কিছু বদলে গেছে।

আমার বরং বইয়ের মলাট খুব তাৎপর্যপূর্ন লাগলো। এটা এঁকেছেন ইউদেরজো নিজে। ছবিতে ওবেলিক্স  এক কাঠের caber ছুঁড়ে দিচ্ছে।  এ যেন অ্যাসটেরিক্সের কমিক্স আঁকার গুরুদায়িত্ব তিনি দিয়ে দিলেন কনরাদকে। পাশে বসে চোখ মেরে, বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অ্যাসটেরিক্স যেন বলতে চাইছে সঠিক হাতেই ন্যস্ত হয়েছে এই ভার।

বেচারা অ্যাসটেরিক্স। তার তো কোন গোচিনি নেই। আজও.....